কোহলবার্গের (Kohlberg) নৈতিক বিকাশের তত্ত্ব

কোহলবার্গ (Kohlberg)

  • আমেরিকান মনোবিদ কোহলবার্গ 1927 সালে জন্মগ্রহন করেন।
  • কোহলবার্গ পিঁয়াজের মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন।
  • নৈতিক বিকাশের তত্ত্বে কোহলবার্গ শিশুদের দার্শনিক (Philosopher) হিসাবে বিবেচনা করেছেন।
  • কোহলবার্গ তাঁর নৈতিক বিকাশের তিনটি পর্যায়ের (Level) কথা বলেছেন এবং প্রতিটি পর্যায়ে দুটি করে স্তর অর্থাৎ, মোট ছ’টি স্তরের কথা বলেছেন।
tet
5000+ WBTET MCQ in Bengali Language. Install & register. completely free of cost

কোহলবার্গের নৈতিক বিকাশের তত্ত্ব (Kohlberg’s theory of Moral Development)

  • কোহলবার্গ তাঁর মতবাদের ভিত্তি হিসাবে মানব প্রকৃতির কয়েকটি বৈশিষ্ট্যকে নির্বাচন করেছেন –
  • প্রথমতঃ, তিনি মূলত নৈতিক বিকাশের প্রক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন, তাই তিনি শৈশবের বিকাশ সম্পর্কে বিশেষ কিছু উল্লেখ করেননি। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, শৈশবে ব্যক্তির কিছু জ্ঞানমূলক বিকাশ হয়। এই বিকাশের ফলে, সে বস্তুগত পরিবেশ এবং মনুষ্য পরিবেশ বা সমাজ পরিবেশের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে। মনুষ্য পরিবেশের মূল বৈশিষ্ট্য হল, সেখানে পরস্পরিক ক্রিয়া হয়। এই পারস্পরিক প্রতিক্রিয়াই হল নৈতিক বিকাশের মূল ভিত্তি।
  • দ্বিতীয়তঃ, কোহলবার্গ বলেছেন, নৈতিক আচরণের কোন প্রক্ষোভিক কেন্দ্র নেই, ‘নীতিবোধ’ বলতে তিনি ন্যায়বিচার বা ন্যায়পরায়ণতাকে (Justice) বুঝিয়েছেন। তাই তাঁর কাছে নীতিবোধ যুক্তিনির্ভর। অর্থাৎ, তাঁর মতে নৈতিক বিকাশ এক ধরনের জ্ঞানমূলক বিকাশ।
  • তৃতীয়তঃ, কোহলবার্গ মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কে বলেছেন, তারা তাদের নিজেদের (a) বহিরাচরণ (Manifest behaviour), (b) ঐ আচরণের উদ্দেশ্য (Intention অফ behaviour) এবং (c) এই আচরণের আভ্যন্তরিন প্রভাব (Consequence) এর মধ্যে পার্থক্য করতে পারে। মানুষের এই তিনটি ক্ষমতা কোহলবার্গের মতে তার নৈতিক বিকাশে সহায়তা করে।
  • কোহলবার্গ বলেছেন, ব্যক্তিজীবনের নৈতিক বিকাশের মূল উপাদান হল তিনটি – (a) জ্ঞানমূলক বিকাশ (Cognitive development) (b) জ্ঞানমূলক স্তরের দ্বন্দ্ব (Moral dilemma) এবং (c) নির্দিষ্ট ভূমিকা গ্রহণের ক্ষমতা (Moral Reasoning or Role taking ability)

(a) জ্ঞানমূলক বিকাশ (Cognitive development) : কোহলবার্গ নৈতিক বিকাশের শর্ত হিসাবে পিঁয়াজের জ্ঞানমূলক জ্ঞানমূলক নীতিকে বলেছেন। তিনি বলেছেন, পিঁয়াজের প্রস্তাবিত বিকাশের স্তর, ব্যক্তির সমাজভিত্তিক নৈতিক বিচারকরণে (Social moral judgment) সহায়তা করে। অর্থাৎ, ব্যক্তির নৈতিক বিচার তার জ্ঞানমূলক বিকাশের উপর নির্ভর করে। কিন্তু, সঙ্গে সঙ্গে কোহলবার্গ এও বলেছেন যে, জ্ঞানমূলক বিকাশই নৈতিক বিকাশের একমাত্র শর্ত বা কারণ নয়।

(b) জ্ঞানমূলক স্তরের দ্বন্দ্ব (Moral dilemma) : নৈতিক বিকাশে অন্য যে উপাদান বিশেষভাবে সহায়তা করে, তা হল জ্ঞানমূলক দ্বন্দ্ব (Moral dilemma) । পরস্পর বিরোধী চিন্তা বা ব্যক্তির বিশ্বাসের সঙ্গে বাহ্যিক পরিবেশের সংঘাতের ফলেই জ্ঞানমূলক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। জ্ঞানমূলক দ্বন্দ্বের প্রক্রিয়া সৃজনাত্মক বা ব্যক্তির নৈতিক বিকাশের সহায়ক।

(c) নির্দিষ্ট ভূমিকা গ্রহণের ক্ষমতা (Moral Reasoning or Role taking ability) : ব্যক্তি তার দ্বন্দ্বের সুষ্ঠু অবসান ঘটাতে পারবে কি না, তা নির্ভর করছে ওপর একটি উপাদনের উপর। কোহলবার্গ এই উপাদনকে বলেছেন ভূমিকা গ্রহণের ক্ষমতা। এই ভূমিকা গ্রহণের ক্ষমতা বিশেষভাবে তার পূর্ব সামাজিক অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে এবং সঙ্গে সঙ্গে এর মাধ্যমে সে অতিরিক্ত সামাজিক অভিজ্ঞতাও অর্জন করে। 

কোহলবার্গের নৈতিক বিকাশের পর্যায় (Level) ও স্তর (Stage) :

কোহলবার্গ তাঁর নৈতিক বিকাশের তিনটি পর্যায়ের (Level) কথা বলেছেন এবং প্রতিটি পর্যায়ে দুটি করে স্তর অর্থাৎ, মোট ছ’টি স্তরের কথা বলেছেন।

Level – Iপ্রাক-সংস্কার নীতিবোধ পর্যায় (Pre Conventional Morality) : 

এই পর্যায়ের সময়কাল 3-7 বছর। এই পর্যায়ে শিশুর নৈতিক আচরণ প্রধানত স্বার্থ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। শাস্তি এড়ানো এবং ব্যক্তিগত সন্তুষ্টি আনয়নের উদ্দেশ্যে শিশু নৈতিক আচরণ করে। এই পর্যায়ে জ্ঞানমূলক বিকাশ এমন পর্যায়ে পৌঁছায়না, যার দ্বারা শিশু নৈতিক ভালোমন্দ বিচার করতে পারে। প্রাক-সংস্কার নীতিবোধ পর্যায় (Pre Conventional Morality) পর্যায়ের দুটি স্তর –

প্রথম স্তর : শাস্তি ও বাধ্যতা (Obedience and punishment orientation) – শাস্তি এড়ানোর জন্য শিশু অন্যের বাধ্য হয় এবং নিয়ম নীতি অনুসরণ করে। কোনো রকম নৈতিক বিচার দ্বারা প্রভাবিত হয় না। (How can I avoid punishment?)

দ্বিতীয় স্তর : ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং  বিনিময় (Individualism and Exchange / Personal Reward Orientation) – এই স্তরে শিশুর নৈতিক আচরণ, তার নিজস্ব চাহিদা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। চাহিদা তৃপ্তির জন্য যে ধরনের আচরণ করার প্রয়োজন শিশু তাই করে। এর ফলে, ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে নীতিবোধের সংঘাত দেখা দেয়। কোহলবার্গ এখানে বদলের নীতির কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন – তুমি আমার বই ছিঁড়েছ, আমি তোমার পুতুল ভাঙব বা আমার সাইকেল ব্যবহার করলে তোমার খেলনা আমাকে দিতে হবে।(What’s in it for me?) (Paying for a benefit)

Level -II → সংস্কার প্রভাবিত নীতিবোধের পর্যায় (Conventional Morality) : এই পর্যায়ের সময়কাল 8-13 বছর। এই পর্যায়ে ব্যক্তির নীতিবোধ বিশেষ সামাজিক রীতিনীতির দ্বারা নির্ধারিত হয়। পরিবার, খেলার দল,ধর্মীয় দল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ইত্যাদির নিয়ম দ্বারা এই সময়কার নৈতিক বিচারকরণের কাজ নিয়ন্ত্রিত হয়। এই পর্যায়ের স্তর দুটি হল –

তৃতীয় স্তর : প্রত্যাশামূলক নীতিবোধের স্তর (Interpersonal Relationship) – এই স্তরে, শিশুর নৈতিক আচরণ তার গোষ্ঠীর প্রত্যাশা দ্বারা নির্ধারিত হয়। তাছাড়া গোষ্ঠীর অন্যান্য সদস্যদের সন্তুষ্টির জন্যও সে প্রয়োজনীয় নৈতিক আচরণ করে। ভালো ছেলে/ ভালো মেয়ে শুনতে চায়।  (Social norms)(The good boy/girl attitude)

চতুর্থ স্তর : সমাজ নিয়ন্ত্রিত ও বিবেক নিয়ন্ত্রিত নীতিবোধের স্তর (Authority and social-order maintaining orientation)- এই স্তরে, শিশুর নৈতিক আচরণ সামাজিক নিয়ম দ্বারা নির্ধারিত হয়। শিশু মনে করে, সমাজের স্বার্থ এবং নিয়মানুযায়ী আচরণ করাই নৈতিক। (Law and order morality)

Level -III → সংস্কারমুক্ত নীতিবোধের পর্যায় (Post-Conventional Morality) – এই পর্যায়ে ব্যক্তির নীতিবোধ আত্মস্বার্থ বা সমাজ স্বার্থের পরিবর্তে, ব্যক্তিগত যুক্তির দ্বারা নির্ধারিত। এই পর্যায়ের স্তর দুটি হল –  

পঞ্চম স্তর : সামাজিক চুক্তি নিয়ন্ত্রিত নীতিবোধের স্তর (Social contract orientation & Individual Rights) – এই স্তরে ব্যক্তির নৈতিক আচরণ বিশেষভাবে সমাজের প্রতি তার দায়িত্ব দ্বারা নির্ধারিত হয়। ব্যক্তি তার জীবন অভিজ্ঞতা দিয়ে উপলব্ধি করে যে, সমাজের সঙ্গে তার একটি অলিখিত চুক্তি আছে। সেই চুক্তি হল সামাজিক মূল্যবোধকে গ্রহণ করা। কারন তার দ্বারা সমাজের সকলের কল্যাণ হবে।

ষষ্ঠ স্তর : সার্বজনীন নীতিবোধের স্তর (Universal ethical principles) – এই স্তরে অর্থাৎ, সর্বশেষ স্তরে, ব্যক্তির নৈতিক আচরণ নিজস্ব বিচারবোধ বা যুক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। তবে এই স্তরের নৈতিক আচরণ আত্মকেন্দ্রিক (Egocentric) নয়। ব্যক্তি সামাজিক রীতিগুলোকেই যুক্তির দ্বারা গ্রহণ করে। অর্থ্যাৎ, এই স্তরে ব্যক্তি তার নৈতিক আচরণগুলোর যুক্তি খুঁজে পায়।

1984 সালে প্রকাশিত তাঁর এক প্রবন্ধে কোহলবার্গ নৈতিক বিকাশের দিক থেকে মানুষকে দু-ভাগে ভাগ করেছেন- A -শ্রেণী (A-Type) এবং B-শ্রেণী (B-Type) ।

A –শ্রেণী(A-Type)- ব্যক্তি – কোহলবার্গ বলেছেন কিছু ব্যক্তির মধ্যে নৈতিক বিকাশের ক্ষেত্রে কর্তৃত্ব এবং নিয়মের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এই ব্যক্তিরা খুব স্বতঃস্ফূর্তভাবে নৈতিক আচরণ সম্পাদন করে না। এই ব্যক্তিদের A শ্রেণীভুক্ত করা হয়েছে।

B –শ্রেণী(B-Type)- ব্যক্তি – কিছু ব্যক্তি আছে যারা উন্নত জীবনাদর্শের পরিপ্রেক্ষিতে নিজের নৈতিক আচরণকে পরিচালিত করে। এদের মধ্যে নৈতিক আচরণের স্বতঃস্ফূর্ততা দেখা যায়। এদেরকে B-শ্রেণীভুক্ত করা হয়েছে।

কোহলবার্গ বলেছেন, নৈতিক বিকাশের সময়, A – শ্রেণীভুক্ত ব্যক্তিদের B – শ্রেণীতে উন্নীত হওয়ার প্রবনতা দেখা গেলেও, B-শ্রেণীভুক্ত ব্যক্তিদের A – শ্রেণীতে আসার প্রবণতা দেখা যায় না। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যক্তিরা নৈতিক বিকাশের সময়, নিজের শ্রেণী-বৈশিষ্ট্য বজায় রাখার চেষ্টা করে।